নিউজ টপ লাইন

স্পট নারায়ণগঞ্জের ভুঁইগড় মানুষ খুন করে ‘রূপায়ন টাউন’

খুনের মামলা সামাল দিতে নিহত হাবিবুরের পরিবারের বিরুদ্ধে দেয়া হয়েছে উল্টো ১৭টি ভুয়া মামলা * মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন সর্দারের ৪২ শতাংশ জমি দখল করে চলছে পাইলিংয়ের কাজ * জমি না কিনেই ৭২ শতাংশ জমিতে গড়ে তুলেছে বহুতল দুটি ভবন * দখল ও ভরাটের হাত থেকে রক্ষা পায়নি সরকারের খাস জমিও ‘এই দেখুন গুলির ছিদ্র। পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করেছে। একপাশের গুলি অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। দেখুন, মাথায়, বুকে- একাধিক গুলি করেছে। ও বাঁচার জন্য কতই না চেষ্টা করেছে। কিন্তু নিষ্ঠুর রূপায়নের লোকরা ওকে বাঁচতে দিল না। অথচ ওর কোনো দোষ ছিল না, নিজেদের জমি বিক্রির ন্যায্য পাওনা দাবি করায় রূপায়ন গ্রুপ গুণ্ডা দিয়ে ওকে খুন করেছে।’ সম্প্রতি যুগান্তর প্রতিবেদকের কাছে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন নারায়ণগঞ্জের ভুঁইগড় এলাকায় রূপায়ন গ্রুপের ক্যাডার বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে খুন হওয়া হাবিবুর রহমান রাসেলের বোন সুফিয়া বেগম।
ভাইহারা এ বোন জানান, রূপায়ন ৫২ শতাংশ জমির বায়না করে টাকা পরিশোধ ছাড়াই জমি ভরাটের উদ্যোগ নেয়। আর এতে বাধা দেয়ায় রাসেলকে খুন করে জমি দখলে নেয় রূপায়ন গ্রুপ। যেখানে এখন গড়ে তোলা হয়েছে ‘নারায়ণগঞ্জ রূপায়ন টাউন’। কিন্তু নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েও ক্ষান্ত হয়নি রূপায়ন, উল্টো ১৭টি ভুয়া মামলা দিয়ে ছয় বছর ধরে তাদের অসহায় পরিবারটিকে নানাভাবে হেনস্তা করে আসছে।
এদিকে শুধু রাসেলদের পরিবার নয়, এমন অনেক মানুষের জমি জোরপূর্বক দখল করে নিয়েছে রূপায়ন গ্রুপ। ভরাট করেছে সরকারি খাস জমি। জাল দলিল দ্বারাও মালিকানা ছিনতাই করে নিয়েছে অনেকের। অসহায় মানুষের সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে গ্রাহকদের কাছে ওইসব জায়গার ওপর গড়ে তোলা বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও ডুপ্লেক্স বাড়ি বিক্রিও শুরু করেছে এই কোম্পানি।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ভুঁইগড়ে রূপায়ন টাউন প্রকল্পের সেকেন্ড ফেইজে ঘটেছে এমন ভয়াবহ দখল-প্রতারণা ও মানুষকে নিঃস্ব করার ঘটনা। এ প্রকল্পে ২৮ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলা হচ্ছে ফ্ল্যাট ও ডুপ্লেক্স বাড়ি। এ আবাসন প্রকল্পের ৭০ ভাগ ওপেন স্পেস রাখা হবে প্রচারণা চালাচ্ছে কোম্পানিটি। যদিও বাস্তবে তার কিছুই নেই।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এসব ঘটনার আদ্যোপান্ত জানতে এক মাস আগে অনুসন্ধান শুরু করে । এরপর একে একে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, রূপায়নের রাক্ষসী ছোবলে জমি ও জীবন হারানো হাবিবুর রহমান রাসেলদের রূপায়ন টাউন প্রকল্পে ৫২ শতাংশ জমি বিক্রির বায়না হয়েছিল ২০০২ সালে। রূপায়ন টাউনের সেকেন্ড ফেইজের প্রবেশ গেটে রাসেলদের সব জমি। অনেক চাপের মুখে সামান্য কিছু টাকা নিয়ে ওই জমি বিক্রি করতে রূপায়নের সঙ্গে বায়না করে রাসেল ও তার স্বজনরা। কিন্তু রূপায়ন গ্রুপ যৎসামান্য কিছু টাকা পরিশোধ করেই ওই জমি দখলে মরিয়া হয়ে মাঠে নামে। প্রতিবারই বাধা দেয় রাসেলের নেতৃত্বে তার স্বজনরা।
পরিবারের ভাষ্য মতে, এতে চরম ক্ষুব্ধ হন রূপায়ন গ্রুপ ও ওই এলাকার তাদের দোসররা। এক পর্যায়ে রূপায়নের লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। সময়টা ছিল ২০০৯ সালের অক্টোবর মাস। রাসেলকে বাসা থেকে ডেকে নেয় রূপায়নের ক্যাডাররা। এরপর রূপায়ন টাউনের ভেতরে নিয়ে তাকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় রূপায়ন টাউন-নারায়ণগঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পিয়ার আলী মজুমদারকে প্রধান এবং নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান ও রূপায়ন টাউন-নারায়ণগঞ্জের সমন্বয়ক নাজিম উদ্দিন আহমেদকে দ্বিতীয় আসামি করে ১৩ জনের নামে মামলা দায়ের করেন নিহত রাসেলের বোন ফৌজিয়া খাতুন। পরবর্তী সময়ে রূপায়নের সঙ্গে পেরে ওঠেনি নিহত রাসেলের পরিবার। অর্থ ও ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে তারা মামলা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সব চেষ্টা করেছেন। নিহত রাসেল ও তার স্বজনদের জমির সিএস ও এসএ দাগ-১৬২৮। প্রসঙ্গত, এ ঘটনায় থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ তা গ্রহণ করেনি। পরে তারা আদালতে মামলা করেন।
নিহত হাবিবুর রহমান রাসেলের ভগ্নিপতি মিজানুর রহমান যুগান্তরকে জানান, ‘বাসা থেকে ডেকে নিয়ে রূপায়নের লোকরা রাসেলকে হত্যা করেছে। ওর দোষ ছিল, নিজেদের জমির ন্যায্য পাওনা দাবি করা। রাসেলকে হত্যা করে রূপায়ন জমি দখলে নিয়েছে। অথচ রূপায়ন এখনও এ জমির পাওনা পরিশোধ করেনি। জমিও রেজিস্ট্রি করে নেয়নি।’
অন্যদিকে জাল দলিল ও ভুয়া মালিক সৃষ্টি করে মনর উদ্দিনের ওয়ারিশদের ৪৪ শতাংশ জমি দখলে নিয়েছে রূপায়ন। জানা যায়, ভুঁইগড় মৌজায় সিএস খতিয়ান-৪১, এসএ খতিয়ান-৫৫, আরএস খতিয়ান-৭০২, সিএস, এসএ দাগ-১২২৭ এবং আরএস দাগ-৩৯২২ এর জমির রেকর্ডসূত্রে মালিক মনর উদ্দিন। তার ওয়ারিশদের ভাষ্য মতে, রূপায়নের একটি অসাধু চক্র জাল টিপসই দিয়ে ওই জমির বিকল্প মালিক সৃষ্টি করে। পরে তারা এ জমির আমমোক্তার দিয়েছে রূপায়নকে। এ ঘটনায় মামলা চলমান রয়েছে। মালিকানা নিষ্পত্তি না হলেও জমি ভরাট করে সীমানা প্রাচীরও গড়ে তুলেছে রূপায়ন।
এ প্রসঙ্গে ওই জমির মালিক (মনর উদ্দিনের ছেলে) সিরাজুল হক যুগান্তরকে জানান, ‘রূপায়ন আমাদের কাছে জমি কিনতে চেয়েছিল। বিক্রি করতে রাজি না হওয়ায় তারা ভুয়া মালিক সৃষ্টি করে ওই জমি দখল করে নিয়েছে।’ তিনি আরও জানান, ‘ওই জমি আমাদের। আমরা রূপায়নের কাছে বিক্রি করিনি। কারও কাছে ওই জমি বিক্রি করেছি, তার কেউ প্রমাণ দিতে পারলে আমরা ফাঁসির শাস্তি মেনে নেব।’
তথ্যানুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, রূপায়ন গ্রুপ এখানে খাস জমিও দখলে নিয়েছে। ভুঁইগড় মৌজাস্থিত আরএস-৩৯২৪, ৩৯২৫ ও ৩৯১১ নম্বর দাগের ৭৩ শতাংশ খাস জমি বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করে রূপায়ন হাউজিং এস্টেট লিমিটেড। ওই জমি এখনও নারায়ণগঞ্জ ডিসি অফিস রূপায়নকে বরাদ্দ দেয়নি। কিন্তু এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট জমিসহ আশপাশের অন্যান্য জমির সঙ্গে সীমানা প্রাচীর করে নিয়েছে রূপায়ন গ্রুপ। এদিকে ওই জমির ৩৯১১ দাগের ৩০ শতাংশের রেকর্ড সংশোধনী মামলা করে নিজের পক্ষে রায় পেয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা নাজিম উদ্দিন এবং তার ভাইয়েরা। কিন্তু জমিটি এখন রূপায়ন হাউজিংয়ের দখলে।
এ প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা নাজিম উদ্দিনে যুগান্তরকে জানান, সিএস, এসএ রেকর্ড সূত্রে আমরা এই জমির মালিক। কিন্তু আরএস রেকর্ডে ভুলবশত তা খাস জমির তালিকায় উঠে যায়। এজন্য আমরা রেকর্ড সংশোধনী মামলা করলে আমাদের পক্ষে রায় আসে। এখন সরকার পক্ষ ওই রায়ের বিপক্ষে আপিল দায়ের করেছে। অথচ জোরপূর্বক জমি দখলে নিয়েছে রূপায়ন গ্রুপ।
এদিকে সমাজের কাছে ইতিমধ্যে ভূমিদস্যু হিসেবে চিহ্নিত রূপায়নের ছোবল থেকে রেহাই মেলেনি ’৭১-এর রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন সর্দারেরও। তার ৪২ শতাংশ জমি জোরপূর্বক দখল করে নিয়েছে রূপায়ন। খোঁজখবরে জানা যায়, ফতুল্লার ভুঁইগড় মৌজার সিএস ও এসএ দাগ ১২২৭-এর রেকর্ডভুক্ত জমির মালিক সুনর উদ্দিন সর্দার। ওয়ারিশ সূত্রে এ জমির মালিক মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন সর্দার গং। এ দাগে মোট জমির পরিমাণ ৮০ শতাংশ। এর মধ্যে ৪২ শতাংশের মালিক মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন সর্দার গং। বাকি ৩৮ শতাংশ খাস জমি। রূপায়ন গ্রুপ সরকারি জমি বরাদ্দ পায়নি এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিও কেনেনি। অথচ সীমানা প্রাচীর দিয়ে তা ভরাট করেছে। এখন সেখানে বহুতল ভবন তৈরির লক্ষ্যে পাইলিং কাজ চলছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ আওয়ামী ওলামা লীগের নারায়ণগঞ্জ জেলার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন সর্দার যুগান্তরকে জানান, ‘সিএস এবং এসএ রেকর্ডসূত্রে ওই জমির মালিক আমরা। কিন্তু আরএস রেকর্ডে ওই জমির সরকারি মালিকানা দেখানো হয়েছে। রেকর্ড সংশোধনী মামলা করে আমার পক্ষে রায় পেয়েছি। সরকার পক্ষ এখন আপিল দায়ের করেছে। এমতাবস্থায় জমির দখল থাকবে আমার কাছে, না হয় সরকারের কাছে। অথচ রূপায়ন সেখানে ভরাট করে বহুতল ভবন তৈরির জন্য পাইলিংয়ের কাজ করছে তা বোধগম্য নয়।’ তিনি বলেন, ‘এটা যেন মগের মুল্লুক পেয়েছে তারা। অথচ একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও তিনি এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারছেন না।’
রূপায়নের প্রতারণার শিকার নারায়ণগঞ্জের বক্তাবলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বী আবুল হোসেনও। ভুঁইগড় মৌজায় তার ৭২ শতাংশ জমি জোরপূর্বক দখল করে বহুতলবিশিষ্ট দুটি ভবনও গড়ে তুলেছে রূপায়ন। জানা যায়, ভুঁইগড় মৌজার সিএস ও এসএ-১২২৭ ও ১২২৮ নম্বর দাগের ৭২ শতাংশ জমির ক্রয়সূত্রে মালিক তিনি। বিক্রি বা বায়না না হলেও ওই জমি জোরপূর্বক দখল করে ৬ তলাবিশিষ্ট দুটি বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে রূপায়ন হাউজিং এস্টেট লিমিটেড। ওই জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে বিলাসবহুল দুটি ভবন। ভবন দুটির নম্বর হচ্ছে ৩৭ ও ৩৮। এ ব্যাপারে জমির মালিক আবুল হোসেন  জানান, অনেকটা বাধ্য হয়ে তিনি এখন রূপায়নের সঙ্গে ওই জমি বিক্রির আলোচনা করছেন। কিন্তু বাজারমূল্য না দিলে তিনি লড়াই চালিয়ে যাবেন।  উল্লেখিত বিভিন্ন অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রূপায়ন টাউন-নারায়ণগঞ্জের সমন্বয়ক ও নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, রাসেল হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। নিহত রাসেল ছিনতাই করতে গেলে লাইসেন্সধারী বন্দুকের গুলিতে মারা যায় সে। এক প্রশ্নের জবাবে জানান, রূপায়ন টাউনে কারোর জমি দখল, সরকারি জমি ভরাট বা জাল দলিল করে কারও মালিকানা কেড়ে নেয়া হয়নি। যারা এসব বলছেন, তারা দালাল ও প্রতারক গ্রুপের সদস্য।

About admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top