নিউজ টপ লাইন

জ্ঞানের বাতিঘর অধ্যাপক রণজিৎ চক্রবর্তী

ডা. শোভন দাশ
চট্টগ্রামের পটিয়ার ধলঘাট ইউনিয়নের বাগদণ্ডী গ্রামের সূর্যসন্তান অধ্যাপক রণজিৎ কুমার চক্রবর্তী। ২০১৭ সালের ৮ মার্চ বুধবার প্রয়াণ ঘটে তাঁর। ধর্মের কঠিন, জটিল নিগুঢ় তত্ত্ব অত্যন্ত সহজ সাবলীল ভাষায় শ্রোতৃমণ্ডলীর কাছে উপস্থাপন করতে জাদুকরী ক্ষমতা ছিলো তাঁর। ইংরেজি শিক্ষাদানে ছিলেন বিশেষ পারঙ্গম, তাঁর ক্লাসে ছাত্ররা তন্ময় হয়ে উপভোগ করতো পাঠদান। জটিল বিষয়গুলো তিনি শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে দিতেন চমৎকার দক্ষতায়। সনাতন ধর্মের পাশাপাশি কোরান, ত্রিপিটক ও বাইবেলের সারবস্তু চমৎকারভাবে শ্রোতাদের মাঝে উপস্থাপন করার সময় সভামঞ্চসহ পুরো এলাকায় নেমে আসতো পিনপতন নীরবতা।
১৯৩৮ সালের ২৮ অক্টোবর এই মণীষির জন্ম হয় পৈত্রিক ভিটেয়। তাঁর পিতা প্রয়াত জ্ঞানেন্দ্রমোহন চক্রবর্তীও ইংরেজীর শিক্ষক, মাতা প্রয়াত দুর্গাবতী চক্রবর্তী ছিলেন রতœগর্ভা। শিক্ষার আলো দান ছিল পারিবারিক ঐতিহ্য। তাঁর ছোট ভাই সমীর চক্রবর্তীও শিক্ষকতায় নিয়োজিত।
ব্রিটিশ উপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামের ঢেউ লেগেছিল বাগদণ্ডী গ্রামের জনপদেও। জনশ্র“তি আছে, গ্রামের ১২১ জন পণ্ডিতের হাতে থাকতো জ্ঞানের লাঠি। সেই থেকেই বাগদণ্ডী গ্রামের নামকরণ। পণ্ডিতদের তর্কযুদ্ধের জন্যও বিখ্যাত ছিল এই গ্রাম। ব্রাহ্মণ অধ্যুষিত অঞ্চলে বসবাসরত অধিকাংশই সংস্কৃত বিষয়ে শিক্ষিত ছিলেন। সময়ের পরিবর্তনে একের পর এক গ্রাম ছেড়ে কেউ শহরমুখী, কেউবা বিদেশগামী হয়েছেন উচ্চশিক্ষা আর চাকুরির সন্ধানে। গ্রামের এই পরিবেশের ছোঁয়া পেয়েছিল জ্ঞানেন্দ্রমোহন চক্রবর্তীর বংশধররা।
রণজিৎ কুমার চক্রবর্তী প্রাথমিক পাঠ শেষ করেন পটিয়ার চক্রশালায় মাতুলালয়ে, এরপর বোয়াখালীর সারোয়াতলী পূর্ণ চন্দ্র সেন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৫৬ সালে প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স পাশ করে বৃত্তিলাভ করেন। স্যার আশুতোষ কলেজ থেকে ১৯৫৮ সালে আই.এ ও বি.এ পাশের পর ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে ইংরেজীতে এম.এ পাশ করে মিশনারী নটরডেম কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। অবশ্য বি.এ পরীক্ষা দেবার পর সারোয়াতলী উচ্চ বিদ্যালয়েও কিছুকাল তিনি শিক্ষকতা করেন। নটরডেম কলেজে ১৯৬১ সালে স্বল্প সময়ের জন্য শিক্ষকতা করার পর যোগ দেন বরিশালের ব্রজমোহন কলেজে। পূর্ব-পাকিস্তানে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৬২ সালে সিলেট এমসি কলেজে কয়েক মাস শিক্ষকতায় নিযুক্ত হন।  এরপর কর্মজীবনে অধ্যাপক রণজিৎ কুমার চক্রবর্তী ১৯৬২ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম কলেজের ইংরেজি বিভাগে শিক্ষকতা করেন। বান্দরবান সরকারি কলেজ, চন্দনাইশের গাছবাড়িয়া সরকারি কলেজ এবং নোয়াখালীর রায়পুর কলেজেও অধ্যাপনা করেন তিনি। ১৯৯৫ সালে রায়পুর কলেজের অধ্যক্ষ পদ থেকে অবসর নেওয়ার কিছুদিন পর অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন রাউজানের নোয়াপাড়া আশালতা কলেজে। এরপর তিনি যোগ দেন ইউএসটিসিতে। ২০০১-২০০৮ পর্যন্ত ওই বিশ^বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। অধ্যাপনায় তিনি এতটাই সফল ছিলেন যে, তাঁর পাঠদান ও বক্তব্যদানের খ্যাতি সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল।
অধ্যাপক রণজিৎ কুমার চক্রবর্তীর সহধর্মীনি সন্ধ্যা চক্রবর্তীও রতœগর্ভা। তাঁদের সুশিক্ষায় বেড়ে ওঠা ছেলে ডা.ঋভুরাজ চক্রবর্তী চমেক হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত। বড় মেয়ে ডা.বনানী চক্রবর্তী বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ সায়েন্স হাসপাতালে শিশুরোগ বিভাগের সহকারি অধ্যাপক এবং ছোট মেয়ে ডা.শ্রাবণী চক্রবর্তী চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের গাইনি বিশেষজ্ঞ। ডা.ঋভুরাজের সহধর্মিনী প্রজ্ঞা পারমিতাও চিকিৎসক। জামাতারাও জড়িত চিকিৎসা পেশায়। ফলে পুরো পরিবার পরিচিতি পেয়েছে ‘সিক্স ডক্টর্স ফ্যামিলি’ নামে।
জ্ঞানের বটবৃক্ষ অধ্যাপক রণজিৎ চক্রবর্তী আমৃত্যু শিক্ষার আলোর প্রদীপ জ¦ালিয়ে গেছেন ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে। বাগদণ্ডী শ্রীশ্রী শীতলা মায়ের মন্দির প্রতিষ্ঠায় রয়েছে তাঁর বিশেষ অবদান।
তাঁর সন্তানরা শহুরে পরিবেশে বড় হলেও গ্রামকে ভুলে যাননি, ভুলে যাননি গ্রামের মানুষকে। ডা.ঋভুরাজ বিভিন্ন সময়ে মেডিক্যাল টিম এনে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ দিয়েছেন গ্রামের মানুষকে। এখানকার কয়েকটি সামাজিক সংগঠনকে গাছের চারা দিয়ে সবুজ বনায়নে সহযোগীতাও করেছেন।
বাগদণ্ডী গ্রামের পল্লী মঙ্গল সমিতির উদ্যোগে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে মঞ্চ নাটক নির্মিত হতো। বাংলা ভাষার আন্দোলনে সমিতির সদস্যরা ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। এই সমিতির উপদেষ্টা ছিলেন অধ্যাপক রণজিৎ চক্রবর্তী। আমার পিতা প্রয়াত ডা. গোপাল চন্দ্র দাশও ওই সংগঠনের কর্ণধার ছিলেন এবং প্রয়াত রণজিৎ চক্রবর্তীর অনুজপ্রতীম হিসেবে তাঁরা একই মনমানসিকতা লালন করতেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁরা মাতৃভূমি ছেড়ে যাননি। শত লাঞ্ছনা-অত্যাচারের মধ্যেও বাগদণ্ডী গ্রামকে আঁকড়ে ধরে পড়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন তাঁরা।
দেশের প্রতি ভালোবাসা, শিক্ষার্থীদের প্রতি সন্তানতুল্য মমত্ববোধ, সুপ্রাচীন কৃষ্টি-আদর্শের উপর সীমাহীন শ্রদ্ধা, দায়িত্ব-কর্তব্য পালনে একনিষ্ঠতা অধ্যাপক রণজিৎ চক্রবর্তীকে নিয়ে গেছে মর্যাদার সর্বোচ্চ আসনে। ধর্মসভা মঞ্চে সনাতন ধর্মের শান্তির বাণী বিলিয়েছেন অকাতরে। তিনি শিক্ষকতা, সনাতন ধর্ম নিয়ে গবেষণা করে গেছেন কিন্তু তার বিনিময়ে নাম, যশ-খ্যাতি, সম্মানের আশা করেন নি। আমৃত্যু কাজ করে গেছেন নিরলস কর্মীর মতো। জীবন সায়াহ্নে বার্ধক্যজনিত কারণে কিছুটা কষ্ট পেলেও সমাজকে তিনি যা দিয়েছেন অকৃত্রিম অকৃপণ অকুন্ঠচিত্তে, তা তাঁকে অমর করে রেখেছে মৃত্যুর পরও।
শুধু একজন শিক্ষক নয়, লেখক হিসেবেও তাঁর ছিল সমান দক্ষতা। বাগ্মী হিসেবে তাঁর যে অসাধারণত্ব ছিল, তা বর্তমান সময়ে বিরল। শিশুসারল্য প্রকাশ পেত তাঁর আচরণে। অধ্যাপক রণজিৎ চক্রবর্তী একটি নাম নয়, একটি সংগঠন তথা একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছেন সবার কাছে। রণে জয়ী রণজিৎ হয়ে উঠেছেন জ্ঞানের বাতিঘর, সবার প্রিয় ‘রণজিৎ স্যার’। দেশ এই মণীষিকে হারিয়ে অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হয়েছে। তবে আজীবন তিনি সত্য ও সুন্দরের যে আরাধনা করে গেছেন, তার অনুকরণ করতে পারলেই স্বার্থক হবে রণজিৎ স্যারের সব প্রচেষ্টা। তিনি আমাদের চলার পথের পাথেয়। লাখো শিক্ষার্থী আর প্রিয় মানুষগুলোর অন্তরে তিনি হয়ে থাকবেন চিরঞ্জীব।

About admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top